মার্কিন-ইইউ বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে বিটকয়েন ৯০,০০০ ডলারের নিচে; সংশোধনের পূর্বাভাসে বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
সম্পাদনা করেছেন: Yuliya Shumai
২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিটকয়েনের মূল্য আবারও দুই মাসের কনসোলিডেশন বা স্থিতাবস্থার সীমার মধ্যে নেমে এসেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল স্তর অতিক্রম করে সেখানে অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর এই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই বাজার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকির ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেন শুরুর ঠিক আগে বিটকয়েন ৯০,০০০ ডলারের স্তরটি পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক বিক্রির চাপ বা সেলিং প্রেসার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে 'ফিয়ার অ্যান্ড গ্রিড ইনডেক্স' আবারও 'ভীতি' (Fear) জোনে ফিরে এসেছে, যদিও কিছু অন-চেইন সূচক এখনও পরস্পরবিরোধী আশাব্যঞ্জক সংকেত প্রদান করছে।
প্রতিবেদনটি তৈরির সময় বিটকয়েন ৮৯,৯৯০ থেকে ৯০,৯০০ ডলারের একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিসরে লেনদেন হচ্ছিল। এই বাজার পরিস্থিতির সাথে পাল্লা দিয়ে মার্কিন ১০-বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার ৪.২৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। কারিগরি বিশ্লেষণে কিছু উদ্বেগজনক কারণ ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে ২১-সপ্তাহের সিম্পল মুভিং অ্যাভারেজ (SMA) ৫১-সপ্তাহের SMA-এর নিচে চলে এসেছে। এই বিশেষ প্যাটার্নটি আর্থিক বাজারে 'ডেথ ক্রস' নামে পরিচিত। তবে ম্যাটেরিয়াল ইন্ডিকেটরসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কিথ অ্যালান মনে করেন, এই প্যাটার্নটি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তৈরি হচ্ছিল এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের পরিবর্তে একটি সামষ্টিক নিম্নবিন্দু বা 'ম্যাক্রো বটম'-এর আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে, অভিজ্ঞ ট্রেডার পিটার ব্র্যান্ড একটি দুই মাসের 'রাইজিং ওয়েজ' প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে বিটকয়েনের মূল্য ৫৮,০০০ থেকে ৬২,০০০ ডলারের জোনে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। এই সম্ভাব্য পতনটি সাম্প্রতিক ৯২,৪০০ ডলারের স্তর থেকে প্রায় ৩৩-৩৭ শতাংশ সংশোধনের সমান হবে। ১৯৭৫ সাল থেকে ট্রেডিং পেশায় যুক্ত ব্র্যান্ড উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সাধারণত ডায়াগোনাল প্যাটার্নে ট্রেড করেন না, তবে তিনি তার পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ভুলের সম্ভাবনাও স্বীকার করেছেন। বর্তমানে ক্রেতাদের জন্য ৯০,০০০ ডলার একটি প্রধান সাপোর্ট লেভেল হিসেবে কাজ করছে, যা চার ঘণ্টার চার্টে ২০০-পিরিয়ড মুভিং অ্যাভারেজের সাথে মিলে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই স্তরটি ধরে রাখতে না পারলে বিটকয়েনের দাম ৮০,০০০ থেকে ৮৫,০০০ ডলারের রেঞ্জে চলে যেতে পারে। আরও হতাশাজনক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের এপ্রিলের সর্বনিম্ন স্তর ৭৪,৫০০ ডলার এবং ২০০-সপ্তাহের মুভিং অ্যাভারেজ ৬৮,০০০ ডলার।
বাজারে মন্দার টেকনিক্যাল সংকেত থাকলেও এর বিপরীতে কিছু ইতিবাচক তথ্যও সামনে এসেছে। অন-চেইন মাইন্ডের বিশ্লেষকরা 'হ্যাশ রিবনস' (Hash Ribbons) সূচকে একটি ক্রয়ের সংকেত বা বাই সিগন্যাল লক্ষ্য করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এমন সংকেত দেখা গিয়েছিল, যার ফলে বিটকয়েনের দাম ৯৮,০০০ ডলার থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ববর্তী সর্বকালীন উচ্চতা ১,২৩,২০০ ডলারে পৌঁছেছিল। এছাড়াও, ক্রিপ্টোকুয়ান্ট লক্ষ্য করেছে যে ফিয়ার অ্যান্ড গ্রিড ইনডেক্সে একটি 'গোল্ডেন ক্রস' তৈরি হয়েছে, যেখানে ৩০-দিনের মুভিং অ্যাভারেজ ২০২৫ সালের মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ৯০-দিনের অ্যাভারেজকে অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষক জুলিও মোরেনোর মতে, এই পরিবর্তনটি সামগ্রিক প্রবণতার তুলনায় স্বল্পমেয়াদী বাজার সেন্টিমেন্টের উন্নতির একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।
বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিটকয়েনের মূল্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। গ্রিনল্যান্ড কেনার দাবির প্রেক্ষিতে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের হুমকি একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে 'অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট' বা পাল্টা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধি পুঁজিকে প্রথাগত নিরাপদ সম্পদ যেমন সোনার দিকে ধাবিত করছে, যার দাম বর্তমানে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ট্রেডার দান ক্রিপ্টো ট্রেডস মন্তব্য করেছেন যে, বিটকয়েনের সাম্প্রতিক ব্রেকআউট প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তিনি এখন ২০২৬ সালের শুরুর দিকের স্তর ৮৭,০০০ ডলারকে একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী সাপোর্ট হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিটকয়েনের এই অস্থিরতা মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা এবং অন্যদিকে খুচরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থা বাজারকে একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিটকয়েন ৯০,০০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক বাধা অতিক্রম করে স্থিতিশীল হতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা। যদি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত না হয় এবং মার্কিন ডলারের শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তবে ডিজিটাল সম্পদের বাজারে আরও গভীর সংশোধনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
ForkLog
The Washington Post
MEXC News
Finbold
Finbold
ForkLog
The Daily Hodl
CryptoPotato
Binance
Bitget News
The Kyiv Independent
Seeking Alpha
Fast Company
Ainvest
FOREX24.PRO
TradingView
BitcoinEthereumNews
Robinhood
Binance
Fast Company
TradingView
The Washington Post
Bitget News
CoinNess
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
